বাংলাদেশের অর্থনীতি চলতি অর্থবছরেও চাপে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমে চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশে নামবে। এর পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণ দায়ী। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া চলতি অর্থবছর শেষে দেশে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলেও বিশ্বব্যাংক তার পূর্বাভাসে জানিয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর অক্টোবর সংখ্যায় সংস্থাটি এ পূর্বাভাস জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংক এও উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক খাতের চাপ।
পূর্বাভাসে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান তৈরি করা। কেননা এখনো ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, যা খুবই বেশি। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ হারে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় একদিকে দেশের বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এ অবস্থায় আরো বেশি নতুন ও শোভন চাকরির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষারও অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে এসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ওয়াশিংটন থেকে সংবাদ সম্মেলনে অনলাইনে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদৌলায়ে সেক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির সিনিয়র ইকোনমিস্ট ধ্রুব শর্মা, ইকোনমিস্ট নাজমুস খান ও সিনিয়র যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরিন এ মাহবুব।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত নিয়ে বিশ্বব্যাংক তার পূর্বাভাসে বলেছে, ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সংকট রয়েছে, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ অনেক বেশি। সরকারের অনেক প্রচেষ্টার পরও তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এছাড়া মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণ কমেছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতিও খারাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবদৌলায়ে সেক বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে শিক্ষিত ও শহুরে বেকার বৃদ্ধি পাওয়াটা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। নানা উদ্যোগ নিয়েও এটি কমানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি, যা সাধারণ মানুষের জীবনমানকে নিচে নামাচ্ছে। পাশাপাশি বৈষম্যও বাড়ছে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ দরকার। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে দ্রুত বিভিন্ন সংস্কার করতে হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে আবদৌলায়ে সেক বলেন, ‘প্রতি বছর ১৭ লাখ তরুণ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে। তবে শুধু পোশাক খাতে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য যথেষ্ট না। এখানে নতুন নতুন খাত সৃষ্টি করতে হবে।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকায় রেমিট্যান্স বেড়েছে। ফলে রিজার্ভ পতনের গতি কমে এসেছে। আবার বৈশ্বিক চাহিদা কমায় এ বছর বাংলাদেশের রফতানিও কমে আসবে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে উল্লেখ করা হয়।